আজকাল খতম তারাবীহর ভয়ে অনেকে তারাবীহর জামা‘আতেই আসেন না। তাছাড়া ছালাত সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে আজকাল হাফেযগণ ক্বিরাআত কে এমন দ্রুত পড়েন, যা কুরআনের অবমাননার শামিল। মুছল্লীরা যা বুঝতে সক্ষম হয় না। অথচ আল্লাহ বলেছেন- যখন কুরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোন ও চুপ থাক’। (সূরা : আ‘রাফ ২০৪)।
এছাড়া ও কুরআন তিলাওয়াত করা কুরআনের অন্যতম হক। কুরআন মাজীদে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এভাবে- তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত কর’ [সূরাহ আনকাবুত : ৪৫]। সহীহভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। তিলাওয়াতের আদবগুলো রক্ষা করতে হবে। সুন্দর উচ্চারণ করে না পড়লে কোর'আন তিলাওয়াতের যথাযথ হক্ব আদায় হবে না।
আবূ হুরায়রা রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে কুরআন সুন্দর উচ্চারণে পড়ে না, সে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল নয়’। [সহীহ বুখারী : ৭৫২৭]। তাই,ধীরস্থীরভাবে তিলাওয়াত করার নির্দেশ দিয়ে কুরআনে বলা হয়েছে। আর কুরআন তিলাওয়াতে রয়েছে বিরাট সাওয়াব।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করে, তাকে একটি নেকি প্রদান করা হয়। প্রতিটি নেকি দশটি নেকির সমান। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ’। [সুনান আত-তিরমিযি : ২৯১০]। কুরআন তিলাওয়াত শুনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি আল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি আমাকে কুরআন পড়ে শুনাও, আমি বললাম, আপনার উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, আমি আপনাকে কীভাবে কুরআন শুনাবো? তখন তিনি বললেন, আমি অপরের নিকট থেকে কুরআন শুনতে ভালবাসি’ - [সহীহ বুখারী : ৫০৪৯]। মহান আল্লাহ বলতেছেন ধীরে ধীরে কোর'আন মাজিদ পড়ার জন্য।আর তাহলে আমাদের হুজুরেরা কি করছে???
তাই,মহান আল্লাহ সুবাহানাহু তা'লা বলছেন : "তুমি কোর'আন কে তারতিলের সাথে তিলাওয়াত কর।"
(সূরা : মুজাম্মিল : ০৪)। তাহলে খতম তারাবিহতে যে স্প্রিডে কোর'আন মাজিদ পড়া হয় এতে কি তারতিলের সাথে তিলাওয়াত করা হয়? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার অনেকে মনে করেন আমি কোর'আন মাজিদ পড়তে জানিনা অন্তত খতম তারাবিহ পড়লে আমার কোর'আন মাজিদ একখতম করা হয়ে যাবে! কোর'আন মাজিদ কি এই জন্য নাযিল হয়েছিল? যে,কোর'আন মাজিদ না পড়ে শুনে শুনে খতম দেওয়ার? পাবলিক যদি নাইই বুঝে যে হুজুর কি পড়ছে তাহলে তার কোর'আন খতম আদৌ কি সম্ভব? জানিনা কোত্থেকে যে পাবলিক এই সকল যুক্তি খাড়া করায়? আপনি ২০রাকাতই পড়ুন,তবে সহিহভাবে ধীরগতিতে, তারতিলের সাথে পড়ুন।
কুরআন মাজীদ সম্মানিত এবং যারা কুরআনের সাথে থাকবে তাঁরাও সম্মানের অধিকারী। এজন্য কুরআনের যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। কুরআন তিলাওয়াতের সময় তাঁর হক আদায় করতে হবে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,‘যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তাঁরা তা পাঠ করে যথার্থভাবে। তাঁরাই তাঁর প্রতি ঈমান আনে। আর যে তা অস্বীকার করে, সে-ই ক্ষতিগ্রস্থ’ [সূরা আল-বাকারাহ : ১২১]।
কুরআনকে মহববত করা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে মহববত করার শামিল। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,‘যে কুরআনকে মহববত করল সে যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে মহববত করল’। [জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম : ৩২৯]। তাই,দ্রুতগতিতে কোর'আন তিলাওয়াত কিন্তু কোর'আনকে অবমাননার শামিল।সুতরাং এই সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করুন। আল্লাহকে ভয় করা উচিত।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, পূর্ব কালে তিন জন ব্যক্তি সফরে বের হয়। পথিমধ্যে তারা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে পতিত হয়। তখন তিন জনে একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ গুহার মুখে একটি বড় পাথর ধসে পড়ে। তাতে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। তিন জনে সাধ্যমত চেষ্টা করেও তা সরাতে ব্যর্থ হয়। তখন তারা পরস্পরে বলতে থাকে যে, এই বিপদ থেকে রক্ষার কেউ নেই আল্লাহ ব্যতীত। অতএব তোমরা আল্লাহকে খুশী করার উদ্দেশ্যে জীবনে কোন সৎকর্ম করে থাকলে সেটি সঠিকভাবে বল এবং তার দোহাই দিয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর। আশা করি তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।
তখন একজন বলল, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট কয়েকটি শিশু সন্তান ছিল। যাদেরকে আমি প্রতিপালন করতাম। আমি প্রতিদিন মেষপাল চরিয়ে যখন ফিরে আসতাম, তখন সন্তানদের পূর্বে পিতা-মাতাকে দুধ পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে রাত হয়ে যায়। অতঃপর আমি দুগ্ধ দোহন করি। ইতিমধ্যে পিতা-মাতা ঘুমিয়ে যান। তখন আমি তাদের মাথার নিকট দুধের পাত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, যতক্ষণ না তারা জেগে ওঠেন। এ সময় ক্ষুধায় আমার বাচ্চারা আমার পায়ের নিকট কেঁদে গড়াগড়ি যায়। কিন্তু আমি পিতা-মাতার পূর্বে তাদেরকে পান করাতে চাইনি। এভাবে ফজর হয়ে যায়। অতঃপর তারা ঘুম থেকে উঠেন ও দুধ পান করেন। তারপরে আমি বাচ্চাদের পান করাই।اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتُ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَفَرِّجْ عَنَّا مَا نَحْنُ فِيهِ مِنْ هَذِهِ الصَّخْرَةِ ‘হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ’লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও’! তখন পাথর কিছুটা সরে গেল এবং তারা আকাশ দেখতে পেল।
দ্বিতীয় জন বলল, হে আল্লাহ! আমার একটা চাচাতো বোন ছিল। যাকে আমি সবচেয়ে ভালবাসতাম। এক সময় তাকে আমি আহবান করলে সে একশ’ দীনার নিয়ে আসতে বলল। আমি বহু কষ্টে একশ’ দীনার জমা করলাম। অতঃপর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। কিন্তু যখন আমি তার প্রতি উদ্যত হ’লাম, তখন সে বলল, يَا عَبْدَ اللهِ اتَّقِ اللهَ، وَلاَ تَفْتَحِ الْخَاتَمَ ‘হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর। আমার সতীত্ব বিনষ্ট করো না’। তৎক্ষণাৎ আমি সেখান থেকে উঠে এলাম। হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ’লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও’! তখন পাথর কিছুটা সরে গেল।
তৃতীয়জন বলল, হে আল্লাহ! আমি জনৈক ব্যক্তিকে এক পাত্র চাউলের বিনিময়ে মজুর নিয়োগ করি। কাজ শেষে আমি তাকে প্রাপ্য দিয়ে দেই। কিন্তু সে কোন কারণবশত তা ছেড়ে চলে যায়। তখন আমি তার প্রাপ্যের বিনিময়ে গরু ও রাখাল পালন করতে থাকলাম। অতঃপর একদিন লোকটি আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার উপর যুলুম করো না। আমার পাওনাটা দিয়ে দাও’। তখন আমি বললাম, এই গরু ও রাখাল সবই তুমি নিয়ে যাও। লোকটি বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করো না’। আমি বললাম, আমি ঠাট্টা করছি না। ঐ গরু ও রাখাল সবই তুমি নিয়ে যাও। অতঃপর লোকটি সব নিয়ে গেল’। হে আল্লাহ! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ’লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও’! তখন পাথরের বাকীটুকু সরে গেল এবং আল্লাহ তাদেরকে মুক্তি দান করলেন’।[ বুখারী হা/৫৯৭৪, ২৯৭২; মুসলিম হা/২৭৪৩; মিশকাত হা/৪৯৩৮ ‘শিষ্টাচার সমূহ’ অধ্যায় ‘সৎকর্ম ও সদ্ব্যবহার’ অনুচ্ছেদ।]
এগুলি হ’ল বৈধ অসীলা সমূহের অন্যতম। যাতে কোন রিয়া ও শ্রুতি ছিল না। কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি কাম্য ছিল। সেজন্য আল্লাহ উপরোক্ত সৎকর্ম সমূহের অসীলায় তাদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন।