বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন ----
"দ্বীনের ভিতরে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের অর্থ এই যে, মানুষ দ্বীনের মধ্যে কোনো কিছু বাড়াবে না, যাতে সে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ফেলে। এমনিভাবে দ্বীনের কোনো অংশ কমাবে না, যাতে সে আল্লাহর নির্ধারিত কিছু অংশ বিলুপ্ত করে দেয়।
আল্লাহর রসূল (ﷺ)-এর জীবনীর অনুসরণ করাও দ্বীনের মধ্যে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের অন্তর্ভুক্ত। তার জীবনাদর্শ অতিক্রম করা দ্বীনের ভিতরে অতিরঞ্জনের শামিল। তার জীবনাদর্শ অনুসরণ না করা তাকে অবহেলা করার অন্তর্ভুক্ত।
.
উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় যে, একজন লোক বলল, "আমি আজীবন রাত্রি বেলা তাহাজ্জুদের ছালাত পড়বো। রাত্রিতে কখনোই নিদ্রা যাব না। কারণ ছালাত সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদাত। তাই আমি ছালাতের মাধ্যমে জীবনের বাকি রাত্রিগুলো জাগরণ করতে চাই। " আমরা তার উত্তরে বলবো - "এই ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে অতিরঞ্জনকারী। সে হক্বের উপর নয়।
রসূল (ﷺ)-এর যুগেও এরকম হয়েছিল যে, তিনজন লোক একত্রিত হয়ে একজন বলল - আমি সারা-রাত ছালাত আদায় করব! আরেকজন বলল, আমি সারাবছর রোযা রাখব, কখনোই ছাড়বো না! তৃতীয়জন বলল, আমি স্ত্রী সহবাস করব না! আল্লাহর রসূল (ﷺ) এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেন, একদল লোকের কি হল যে, তারা এরকম কথা বলে থাকে? অথচ আমি রোযা রাখি এবং কখনো রোযা থেকে বিরত থাকি। রাতে ঘুমাই এবং আল্লাহর ইবাদাত করি। স্ত্রীদের সাথেও মিলিত হই। এটি আমার সুন্নাত। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ থাকবে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
এই লোকেরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কারণে রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের সাথে সম্পর্কছেদের ঘোষণা করলেন। কেননা, তারা সিয়াম, রাত্রি জাগরণ, স্ত্রী সহবাস করার ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাতকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিল। দ্বীনী বিষয়ে যে ব্যক্তি বলবে যে, আমার নফল ইবাদাতের দরকার নেই শুধু ফরয ইবাদাতগুলো করব, আসলে সে ফরয আমলেও অবহেলা করে থাকে। সঠিক পথের অনুসারী হল সেই ব্যক্তি যে রসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাহর উপর চলবে।
.
অন্য একটা উদাহরণ হল, মনে করুন - তিনজন মুখলিস লোকের পাশে রয়েছে একজন ফাসেক লোক।তিনজনের একজন বলল, আমি এই ফাসেককে ছালাম দিব না। অপর একজন বলল, আমি এর সাথে চলব, তাকে ছালাত দিব, তাকে দাওয়াত দিব ও তার দাওয়াতে শরীক হব। আমার নিকটে সে অন্যান্য সৎ লোকের মতোই! তৃতীয়জন বলল, আমি এই ফাসেক ব্যক্রিকে তার পাপাচারিতার কারণে ঘৃণা করি। তার ভিতরে ঈমান থাকার কারণে তাকে ভালবাসি। তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করব না। তাকে বয়কট করলে যদি তার পাপাচারিতা আরো বেড়ে যাওয়ার আশংকা হয়, তবে তাকে বয়কট করব না। "
এই তিনজনের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি বেশী বাড়াবাড়ি করল। দ্বিতীয়জন ত্রুটি করল এবং তৃতীয়জন মধ্যমপন্থা ও সঠিক পথের অনুসরণ করল। অন্যান্য সকল ইবাদাত ও মুয়ামালাতের ক্ষেত্রেও অনুরূপ - মানুষ এতে ত্রুটি, বাড়াবাড়ি এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে থাকে।
.
আরো একটি উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করুন - একজন লোক তার স্ত্রীর কথায় চলে। তার স্ত্রী তাকে যেখানে পাঠায় সেখানে যায়। সে তার স্ত্রীর অন্যায় কাজ হতে বাধা প্রদান করে না এবং ভাল কাজে উৎসাহ দেয় না। সকল ক্ষেত্রেই স্ত্রী তার উপর কর্তত্ব করছে এবং তার মনিব হয়ে বসেছে। আরেক ব্যক্তি স্ত্রীর কোনো ব্যাপারেই গুরুত্ব দেয় না। তার স্ত্রীর সাথে অহংকার করে চলে। যেন তার স্ত্রী চাকরানীর চেয়েও অবহেলিত। অন্য আরেকজন ব্যক্তি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করত: আল্লাহ ও তার রসূল (ﷺ)-এর প্রদত্ত্ব সীমা অনুযায়ী স্ত্রীর সাথে আচরণ করে থাকে। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন -- "তাদের (স্ত্রীদের) তোমাদের উপর হক্ব রয়েছে, যেমন তাদের উপর তোমাদের হক্ব রয়েছে" --- [ সুরাহ আল বাকারাহ, আয়াত : ২২৮ ]।
কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করবে না। স্ত্রীর কোনো একটি চরিত্রকে অপছন্দ করলে হয়ত অন্য একটি গুণ দেখে সে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।"
এখানে শেষ ব্যক্তি মধ্যমপন্থী। প্রথম ব্যক্তি স্ত্রীর সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় শিথিল এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি ত্রুটিকারী (অবহেলা ও অবজ্ঞাকারী)।
.
হে পাঠক! আপনি সকল ইবাদাত ও আচার-আচরণে
উক্ত উদাহরণগুলোর উপর অনুমান করুন।
.
গৃহীত :
--- [ ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম : ৬১ - ৬৩ ]
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬