মহিলারা কি ঘরে ইতিকাফ করতে পারবে?

ইতিকাফ একটি ইবাদত আর প্রত্যেক ইবাদতের মত এর আহকামও শরীয়তের নির্দেশনা থেকে নেওয়া উচিত কেননা ইসলামে কোন আমল সহীহ্ হওয়ার জন্য আবেগ দিয়ে নয় বরং কুরআন এবং হাদিসের বুঝ দিয়ে এর সহীহ অথবা ভুলের ফায়সালা করতে হবে।
 
আরবি ‘ইতিকাফ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অবস্থান করা, স্থির থাকা, কোনো স্থানে আটকে পড়া বা আবদ্ধ হয়ে থাকা। শরিয়তের পরিভাষায় ব্যক্তি জাগতিক কাজকর্ম ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইবাদতের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা ও স্থির থাকাকে ইতিকাফ বলে। 
 
যার দ্বারা জানা যায় যে ইতিকাফ এমন এক আমল যার সম্পর্ক মসজিদের সাথে সম্মন্ধযুক্ত আর এজন্য শরীয়তে যেখানেই ইতিকাফের বৈধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে মসজিদের কথা এসেছে। যেমন কুরআনের আয়াত --- "তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানকে গ্রহন করো।আর ইবরাহীম ও ইসমা’ঈল কে আদেশ দিয়েছিলাম তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী, রুকূ’ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার ঘরকে পবিত্র রাখতে।" --- (সুরা বাকারা: ১২৫)
অন্য এক জায়গায় বলেন, "আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না।--- ( সুরা বাকারা : ১৮৭)
 
হাফেজ ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাপারে বলেন, " এই আয়াতে এই কথার দলিল রয়েছে যে ইতিকাফ যদি মসজিদে ছাড়া অন্য কোথাও করা সঠিক হতো তাহলে সংঘত হওয়ার নিষেধাজ্ঞা মসজিদের সাথে নির্দিষ্ট হতো না! কারণ ইতিকাফ থাকা অবস্থায় সংগত হওয়া জায়েয নেই। ইতিকাফের সাথে মসজিদের উল্লেখ থাকা দ্বারা প্রমাণ হয় যে, ইতিকাফ মসজিদ ছাড়া আর কোথাও জায়েয নেই। --- (ফাতহুল বারী ৪/২৭১)
 
তিনি আরো বলেন, উলামাগণ ইতিকাফের জন্য মসজিদ শর্ত হওয়ার উপর ঐকমত পোষণ করেছেন। --- (ফাতহুল বারী ৪/২৭২)
একই মত পোষণ করে ইবনে কুদামা আল মাকদীসি রহিমাহুল্লাহ বলেন, উলামাদের মধ্যে মসজিদে ছাড়া ইতিকাফ সহীহ না হওয়ার ঐক্যমত রয়েছে। --- ( আল মুগনি, ৩/১৮৯)
ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ বলেন,  আলেমদের ঐক্যমত রয়েছে যে, ইতিকাফ মসজিদ ছাড়া আর কোথাও বৈধ নয়।  (তাফসীরে কুরতুবি, ২/৩৩২)
 
এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে ইতিকাফের জন্য মসজিদ হওয়া জরুরি। কিন্তু কিছু ভাই বলেন এই বিষয়টা পুরূষদের জন্য কিন্তু মহিলাদের জন্য নয় কেননা মহিলাদের মসজিদ সেটা যেটা তারা ঘরে নামাযের জন্য একটি জায়গা ঠিক করে নেন। অথচ তাদের এই কথার কোন সঠিক দলিল নেই যেখানে উসুল হচ্ছে, যখন কোন শব্দ মুত্বলাক্ব ব্যবহার হয় সেখান থেকে এর فرد اعلی উদ্দেশ্য নেওয়া। অতএব, এইখানে মসজিদ দ্বারা উদ্দেশ্য হল এলাকার সেসব মসজিদ যেখানে পাচ ওয়াক্ত নামাযের আজান আর ইকামাতের সাথে জামাতবদ্ব হয়ে নামায আদায় করা হয়।
 
আর এই বিষয়ে পুরুষ এবং মহিলা দুজনেই বরাবর যার সমর্থন সহীহ বুখারীর এই হাদিসে রয়েছে, 
আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত- তিনি বলেন- আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমযানে ইতিকাফ করতেন। ফযরের নামাজ শেষে ইতিকাফের নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ করতেন। ‘আয়িশা (রাযি.) তাঁর কাছে ইতিকাফ করার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। ‘আয়িশা (রাযি.) মসজিদে (নিজের জন্য) একটি তাঁবু করে নিলেন। হাফসাহ (রাযি.) তা শুনে (নিজের জন্য) একটি তাঁবু তৈরি করে নিলেন এবং যায়নাব (রাযি.)-ও তা শুনে (নিজের জন্য) আরো একটি তাঁবু বানিয়ে করে নিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযরের নামায শেষে এসে ৪টি তাঁবু দেখতে পেয়ে বললেন- একী? তাঁকে তাঁদের ব্যাপার জানানো হলে, তিনি বললেন- নেক আমলের প্রেরণা তাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেনি। সব খুলে ফেলা হল। তিনি সেই রমাযানে আর ই‘তিকাফ করলেন না। পরে শাওয়াল মাসের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করেন। ( বুখারী, ২০৩৩)
 
এই হাদিস দ্বারা ইমাম বুখারী বাব বেধেছেন, "মহিলাদের ইতিকাফ " নামে।যার দ্বারা বুঝা যায় ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ এর নিকট মহিলাদের ইতিকাফ মসজিদেই হবে।
অন্য একটি হাদিসে রয়েছে, ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের শেষ দশক ই‘তিকাফ করতেন। তাঁর ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তাঁর সহধর্মিণীগণও (সে দিনগুলোতে) ই‘তিকাফ করতেন। -(বুখারী, ২০২৬)

ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন, আর এসব হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণ হয় যে ইতিকাফ মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও বৈধ নয়। --- (শরহু সহীহ মুসলিম, ১/৩৭২)
আল্লামা যায়লায়ী হানাফি রহিমাহুল্লাহও একই কথা বলেন। --- (ফাতহুল মুলহিম, ৩/১৯৭)
এরপর ঘর যে মসজিদ হয় না তার কিছু যুক্তিও উল্লেখ করা যায়, কারণ মসজিদের যেসব আহকাম রয়েছে সেগুলো কি ঘরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? 
১:- হায়েজগ্রস্ত মহিলা যেতে পারবে না?
২:- ঘরে কি বসার আগে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া হয়?
৩:- সেখানে কি ব্যবসায়ীক আলোচনা বারণ রয়েছে? 
৪:- ঘরে কি সংঘত হওয়ার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে? 
৫:- ওইখানে কি হারিয়ে যাওয়া বস্তুর ই'লান করা যাবে না?
৬:- সেখানে কি হদ কায়েম করা যাবে না?
৭:- ঘরে কি জুম'আর নামাজ আদায় হয়?
৮:- ঘরে কি ৫ ওয়াক্ত আযান হয়?
 
নয়তো রাসুলের হাদিস রয়েছে, সমস্ত যমীন আমার জন্যে সালাত আদায়ের স্থান ও পবিত্রতা অর্জনের উপায় করা হয়েছে।(বুখারী, ৪২৭) এখন কোন জ্ঞানী ব্যক্তি এই হাদিস দিয়ে ইস্তিদালাল করে, যেকোন জায়গায় রাস্তার উপর টেন্ট লাগিয়ে বলে সমস্ত জমিন মসজিদ আর মসজিদে ইতিকাফ করা হয়!এভাবে কি সমস্ত জমিনে ইতিকাফ করা যাবে? অথচ এই হাদিসে মসজিদ উদ্দেশ্য সেই মসজিদ নয়, বরং মসজিদ না পাওয়াতে নামায পড়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। 
এই কারণটাও পেশ করা হয় যে, কোন এলাকায় মসজিদে ব্যবস্থা না থাকলে কি আর করা?
 
এর জবাবে বলতে হয় ইতিকাফ ওয়াজিব নয়, যদি শর্ত পূরণ করা যায় তাহলে ইতিকাফ হবে নয়তো ইতিকাফ সহীহ হবে না।নয়তো এমন অনেক মহিলাদের পাওয়া যাবে যারা অনেকবার ইতিকাফ করেছেন কিন্তু কখনো জুম'আ অথবা ঈদের নামাজ আদায় করেনি, এর জবাবে তারা বলে এইটা মহিলাদের জন্য ওয়াজিব নয় অথবা এলাকার মসজিদে কোন ব্যবস্থা না থাকলে কি করবো!তাদের বলতে চাই ইতিকাফের বিষয়টাও একই।বরং ফরজ ইবাদতের ক্ষেত্রে দেখেন, যদি কেউ যথেষ্ট টাকা না থাকার ফলে হজ অথবা ওমরা করতে যেতে না পারলে তার জন্য আর কাবা তো বাংলাদেশে আনা সম্ভব নয়, আর না তার এলাকার মসযিদে হজ্ব করা সম্ভব!
আরো বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে আর পারছি না। আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, যেন আল্লাহ সকল বোনদের মসজিদে ইতিকাফ করার ব্যবস্থা করেন দেন।
 
লেখক :ওমর ফারুক রায়হান ( আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আমীন)। 

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post

Contact Form