১০০ বছরের শেষ্ঠ হাদীসের পণ্ডিত...শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহ) (১৯১৪–১৯৯৯)

আধুনিক যুগে যদি এমন একজন আলেমের নাম বলা হয়, যিনি একাই হাদীসশাস্ত্রের জগতে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছেন, সহীহ ও যঈফ হাদীসকে পৃথক করে উম্মাহর সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, বিদআত, জাল বর্ণনা ও অন্ধ তাকলীদের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেছেন এবং মানুষকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য নিরলস মেহনত করেছেন..তাহলে নিঃসন্দেহে সেই নাম হবে শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহ.)।


তিনি ছিলেন আধুনিক যুগের যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, একজন বিরল গবেষক, অসাধারণ মুহাক্কিক এবং সুন্নাহর এক নির্ভীক খাদেম। বিংশ শতাব্দীতে হাদীসশাস্ত্রের পুনর্জাগরণে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আজ পৃথিবীর বিভিন্ন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র ও মাদরাসায় তাঁর তাহকীক ছাড়া হাদীস গবেষণা কল্পনাই করা যায় না।


১৯১৪ সালে আলবেনিয়ার আশকোদরায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার সিরিয়ায় হিজরত করে। সেখানেই তিনি বড় হন এবং ইলম অর্জন করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন আলেম। ছোটবেলা থেকেই তিনি কুরআন, আরবি ভাষা ও শরয়ী ইলমের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো..তিনি কোনো বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ছিলেন না, বরং নিজের মেহনত, গবেষণা, অধ্যবসায় ও আল্লাহপ্রদত্ত মেধার মাধ্যমে তিনি হাদীসশাস্ত্রের ইমামে পরিণত হন।

জীবিকার জন্য তিনি ঘড়ি মেরামতের কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর আসল জীবন ছিল কিতাব, লাইব্রেরি, হাদীস, সনদ ও তাহকীকের জীবন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তিনি লাইব্রেরির ধুলোমাখা তাকের মাঝে বসে হাজার হাজার হাদীস, রাবী ও কিতাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর পুরো জীবন কেটেছে সহীহ ও যঈফ হাদীস পৃথক করার কাজে।


যখন উম্মাহর বড় একটি অংশ জাল, দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনার উপর আমল করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তখন শাইখ আলবানী (রাহ.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন..

দ্বীনের ভিত্তি হবে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ; কোনো ব্যক্তি, পীর, মাযহাব বা অন্ধ তাকলীদ নয়।

তিনি ছিলেন হকের ব্যাপারে অত্যন্ত দৃঢ় ও আপসহীন। বিদআত, কুসংস্কার, জাল হাদীস ও অন্ধ অনুসরণের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক ভয়ংকর ইলমী ঝড়। তাঁর তাহকীক ও দলিলভিত্তিক আলোচনা বহু বিদআতপন্থী ও বাতিল আকিদার অনুসারীদের কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কারণ তিনি আবেগ দিয়ে নয়; সরাসরি কুরআন ও সহীহ হাদীসের অকাট্য দলিল দিয়ে কথা বলতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি, তাহকীক, গবেষণা ও দলিল উপস্থাপনের ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। আধুনিক যুগে হাদীসশাস্ত্রে তাঁর মতো গভীর গবেষক খুব কমই জন্ম নিয়েছেন। তিনি হাজার হাজার হাদীসের তাহকীক করেছেন এবং অসংখ্য কিতাবকে নতুনভাবে যাচাই-বাছাই করে উম্মাহর সামনে উপস্থাপন করেছেন।


তিনি শুধু একজন মুহাদ্দিসই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন সুন্নাহর একজন মুজাহিদ। তাঁর দাওয়াত ছিল মানুষকে ব্যক্তি পূজা থেকে বের করে রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর সহীহ সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনা। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন...

সহীহ হাদীসের সামনে কারো কথাই গ্রহণযোগ্য নয়।

তাঁর বিখ্যাত কিতাবগুলোর মধ্যে রয়েছে..

• সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ

• সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দাঈফাহ ওয়াল মাওযূআহ

• ইরওয়াউল গালীল

• সিফাতু সালাতিন নবী (ছা:)

• আদাবুয যিফাফ

• তামামুল মিনাহ

• হিজাবুল মারআতিল মুসলিমাহ

• আহকামুল জানায়েয

• সাহিহুল জামে’ আস-সাগীর

• দাঈফুল জামে’ আস-সাগীর

• মিশকাতুল মাসাবীহ-এর তাহকীক

• সুনানে আবু দাউদ-এর তাহকীক

• সুনানে তিরমিযী-এর তাহকীক

• সুনানে নাসাঈ-এর তাহকীক

• সুনানে ইবনে মাজাহ-এর তাহকীক

• সহীহ ইবনে খুযাইমাহ-এর তাহকীক

• মুখতাসার সহীহ মুসলিম

• মুখতাসার সহীহ বুখারী

• কিয়ামু রামাদান

• সালাতুত তারাবীহ

• আত-তাওয়াসসুল

• তাহযীরুস সাজিদ

• জিলবাবুল মারআতিল মুসলিমাহ

• আসলু সিফাতি সালাতিন নবী (ছা:)

এবং আরও শতাধিক অমূল্য গ্রন্থ।


তাঁর বহু কিতাব বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আজও পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ তাঁর কিতাব পড়ে সহীহ আকিদা ও সহীহ সুন্নাহর পথে ফিরে আসছে।

হাদীসশাস্ত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে তাঁকে “বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার” প্রদান করা হয়। এটি ছিল তাঁর ইলমী মর্যাদার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি।

তাঁর বিরোধীরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, হাদীসশাস্ত্রে তাঁর গভীরতা, তাহকীক ও গবেষণা ছিল অসাধারণ। বহু বড় বড় আলেম তাঁর ইলমী মর্যাদাকে সম্মান করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছাত্ররা তাঁর কাছে ইলম অর্জনের জন্য ছুটে যেত।


১৯৯৯ সালের ২ অক্টোবর জর্ডানের আম্মানে এই মহান মুহাদ্দিস ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর ইলম আজও জীবিত। তাঁর কিতাব আজও তাওহীদ ও সুন্নাহর পথে মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছে। তাঁর গবেষণা আজও বিদআত, জাল হাদীস ও বাতিল আকিদার বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে আছে।

বর্তমান যুগে সহীহ-যঈফ হাদীস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শাইখ আলবানী (রাহ.) এক মাইলফলক। তিনি ছিলেন দলিলের আলেম, সুন্নাহর সৈনিক এবং হাদীসশাস্ত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

আল্লাহ তাআলা শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহ.)-কে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত ও আলোকিত করুন, তাঁর সকল খেদমত কবুল করুন এবং আমাদেরকেও কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর উপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন।

আমিন!!

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post

Contact Form