সন্তান ঘুমিয়ে আছে… অথচ মা-বাবার চোখে তখনও ঘুম নেই। মনে একটাই চিন্তা—“আল্লাহ, আমার সন্তানটাকে সব বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ রাখুন।”
সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক অমূল্য আমানত। তার সুস্থতা, নিরাপত্তা ও ঈমানের জন্য দোয়া করা মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব। সন্তান অসুস্থ হলে, ভয় পেলে, অস্বস্তিতে থাকলে কিংবা বদনজর বা অন্য কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা হলে কুরআনের আয়াত ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দোয়া পড়ে শরয়ি রুকইয়াহ করা যায়।
কীভাবে সন্তানের জন্য রুকইয়াহ করবেন?
সন্তানের মাথায় বা শরীরে ভালোবাসার সঙ্গে হাত রেখে আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও সুস্থতার নিয়তে কুরআনের আয়াত ও মাসনূন দোয়া পড়ুন।
১. সূরা ফাতিহা
সূরা ফাতিহা রুকইয়াহ হিসেবে পড়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী পড়ুন। তবে নির্দিষ্টভাবে সাতবার পড়তেই হবে—এমন সহিহ দলিল নেই।
২. আয়াতুল কুরসি
اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ...
— সূরা আল-বাকারা: ২৫৫
৩. সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ...
— সূরা আল-বাকারা: ২৮৫–২৮৬
৪. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস
সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়ার কথা হাদিসে এসেছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«اقْرَأْ: قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ، وَالْمُعَوِّذَتَيْنِ حِينَ تُمْسِي وَحِينَ تُصْبِحُ، ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، تَكْفِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ»
“সকাল ও সন্ধ্যায় ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ এবং দুই মু‘আওয়িযাত (সূরা ফালাক ও নাস) তিনবার করে পড়ো; এগুলো তোমার জন্য সবকিছুর ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে।”
—রিয়াদুস সালিহীন: ১৪৫৬
সন্তানের জন্য এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ুন
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর নাতি হাসান ও হুসাইন (রাঃ)-এর জন্য পড়তেন—
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
আ‘ঊযু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি ‘আইনিন লাম্মাহ।
“আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের মাধ্যমে আশ্রয় নিচ্ছি—প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর বদনজর থেকে।”
—সহিহ আল-বুখারি: ৩৩৭১
একবার ভাবুন—যে দোয়া রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের প্রিয় নাতিদের জন্য পড়েছেন, সেই দোয়াটি আমাদের সন্তানদের জন্য পড়তে কতটুকুই বা সময় লাগে?
অসুস্থ সন্তানের জন্য পড়ুন
بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
বিসমিল্লাহি আরকীক, মিন কুল্লি শাইইন ইউ’যীক, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও ‘আইনি হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফীক, বিসমিল্লাহি আরকীক।
“আল্লাহর নামে তোমার জন্য রুকইয়াহ করছি—যে কোনো কষ্টদায়ক বিষয় থেকে, প্রত্যেক ব্যক্তি বা হিংসুকের বদনজরের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করুন। আল্লাহর নামেই তোমার জন্য রুকইয়াহ করছি।”
—জামে‘ আত-তিরমিজি: ৯৭২
সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়াটিও পড়ুন
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা‘আ ইসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়া লা ফিস সামা-ই, ওয়া হুয়াস সামী‘উল আলীম।
“আল্লাহর নামে—যাঁর নামের সঙ্গে থাকলে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার পড়ার কথা হাদিসে এসেছে।
—জামে‘ আত-তিরমিজি: ৩৩৮৮
রুকইয়াহ করার সময়
কুরআনের আয়াত ও দোয়া পড়ে হালকা ফুঁ দিতে পারেন এবং সন্তানের মাথা বা শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে পারেন।
মনে রাখবেন—শিফা দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। কুরআনের আয়াত ও দোয়া হলো তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়ার মাধ্যম।
সন্তানকে নিয়ে একটু সতর্ক হোন!
আজকাল আমরা নিজের অজান্তেই সন্তানদের জীবনের অনেক কিছু মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিই।
সন্তানের প্রতিটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা কি সত্যিই জরুরি?
তার পরীক্ষার ফলাফল, অসাধারণ মেধা, সাফল্য—সবকিছু কি সবাইকে জানানো প্রয়োজন?
সে কুরআন হিফজ করেছে, খুব সুন্দর পড়ছে, অসাধারণ প্রতিভাবান—এসব কি প্রত্যেকের সামনে বলে বেড়ানো দরকার?
সন্তান আপনার নেয়ামত। প্রতিটি নেয়ামত প্রদর্শনের বিষয় নয়; কিছু নেয়ামত আড়ালে রেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাও প্রজ্ঞার পরিচয়।
সন্তানের কোনো ভালো গুণের কথা বললে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন—
مَا شَاءَ اللَّهُ
মাশাআল্লাহ।
لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই।
اللَّهُمَّ بَارِكْ
হে আল্লাহ, এতে বরকত দিন।
আর সবচেয়ে বড় কথা—সন্তান ঘুমিয়ে গেলে তার মাথায় হাত রেখে একটু দোয়া করুন।
হয়তো সে জানে না, তার ছোট্ট জীবনের জন্য কেউ একজন গভীর রাতে আল্লাহর কাছে কাঁদছে।
হয়তো সে জানে না, তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের নিরাপত্তার জন্য তার মা-বাবা আল্লাহর দরজায় হাত তুলছে।
আর হয়তো আপনার সেই নীরব দোয়াটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় হেফাজতের কারণ হয়ে যাবে।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের ঈমান, সুস্থতা ও নেক হায়াত দান করুন এবং সব ধরনের অনিষ্ট ও বদনজর থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
📌 পোস্টটি সংরক্ষণ করে রাখুন, যেন প্রয়োজনের সময় দোয়াগুলো সহজেই খুঁজে পান। অন্য কোনো মা-বাবার উপকারে আসতে পারে মনে হলে শে'য়ার করে দিন।
— সংগৃহীত