এ কথায় কোনও সন্দেহ নাই যে, কুরআন শুধু মুসলিমদের নয় বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষ সকল মানুষের জন্য বিশ্বস্রষ্টা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক চিরন্তন দিক নির্দেশনা। [সূরা বাকারা: ১৮৫] এই কুরআন অনুসরণের মধ্যেই বিশ্বমানবতার চূড়ান্ত মুক্তি, সফলতা ও সর্বোচ্চ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কারণ কুরআন মানব রচিত কোনও কথা নয়। বরং তা এসেছে সাত আসমান থেকে। সবচেয়ে সম্মানিত ফেরেশতা জিবরাইল আ. এর মারফতের স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মানুষকে সত্যের পথ নির্দেশনা দেয়ার উদ্দেশ্যে তা প্রেরণ করেছেন।
অত:এব যে যে ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন সে যদি আল্লাহর বাণীকে সম্মান করেন তাহলে সেও সম্মানিত হবে আর যদি তাকে অপমানিত করে তাহলে সেও নিশ্চিতভাবে অপমানিত, লাঞ্ছিত এবং ধ্বংসপ্রাপ্তদের দলভুক্ত হবে।
সুতরাং যে বা যারা হিন্দুদের পূজামণ্ডপে (যেখানে সরাসরি আল্লাহর সাথে শিরকের মত সবচেয়ে বড় অপরাধ করা হয়) খড়কুটা দ্বারা তৈরি হনুমানের মূর্তির পায়ের কাছে রেখে কুরআনকে অপমান করতে চেয়েছে নিশ্চয় তারা দুনিয়াতে লাঞ্ছিত হবে এবং আখিরাতে হবে জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডের ইন্ধন যদি জীবদ্দশায় সে মহান স্রষ্টা আল্লাহর কাছে নিজে ভুল তুলে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা না করে।
আর হ্যাঁ, কেউ যদি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টার অংশ হিসেবে এমনটি করে থাকে তাহলে আশা করি, তাদের এই হীন উদ্দেশ্য সফল হবে না বরং বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ তাদের অপকৌশল রুখে দিবে ইনশাআল্লাহ। আশা করব, বাংলাদেশ সরকার অনতিবিলম্বে এসব হীন চক্রান্তকারীদেরকে খুঁজে বের করে এনে জাতির সামনে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান করবেন।
পাশাপাশি আরও বলতে চাই, এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বঞ্চিত যে সকল আবেগী মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে হিন্দুদের বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে হামলা করেছে তারাও ইসলামের আদর্শ পরিপন্থী কাজ করেছে। এদের খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, এরা অধিকাংশই হয়ত কুরআন দেখে দেখে পড়ার যোগ্যতা রাখে না বা বছরে একবার কুরআন খুলে কি না সন্দেহ।
এরা যে কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শচ্যুত তার প্রমাণ কুরআনের নিম্নোক্ত বাণী সমূহ:
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ ۗ كَذَٰلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّهِم مَّرْجِعُهُمْ فَيُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"তোমরা তাদেরকে গালি দিও না যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। তাহলে তারা ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশত: আল্লাহকে গালি দিবে। এভাবেই আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে তাদের কাজ কর্ম সুশোভিত করে দিয়েছি। অতঃপর স্বীয় পালনকর্তার কাছে তাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে বলে দেবেন যা কিছু তারা করত।" [সূরা আনআম: ১০৮]
◈ তিনি আরও বলেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىَ
“আর কোনও লোকদলের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন ন্যায় সঙ্গত আচরণ থেকে বিচ্যুত হতে তোমাদের প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর-এটাই আল্লাহ ভীতির অধিক নিকটবর্তী।” [সূরা মায়েদা: ৮]
◈ তিনি আরও বলেন,
لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّـهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
“দ্বীন-ইসলামের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন।” [সূরা মুমতাহিনা: ৮]
সর্বোপরি কথা হল, কুরআনের অবমানে প্রতিটি মুসলিমের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হবে-এটাই স্বভাবজাত ঈমানের দাবী। এ জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদ করতে হবে। তবে অতিরিক্ত আবেগ যেন আমাদেরকে অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের দিকে ধাবিত না করে।
আর শুধু প্রতিবাদ ও রক্তগরম করা শ্লোগানের মধ্যেই যেন কুরআনের প্রতি আমাদের ভালবাসা ও সম্মান-শ্রদ্ধা সীমিত না থাকে বরং এ জন্য আমদের কর্তব্য, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা, কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানা, অধ্যয়ন ও গবেষণা করা, কুরআনের শিক্ষায় নিজেদের জীবন, পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করা এবং সুন্দরতম পন্থায় কুরআনের দিকে অমুসলিমদেরকে আহ্বান করা। এর মধ্যেই কুরআনের প্রতি আমাদের প্রকৃত ভালবাসা প্রতীয়মান হবে।
দুআ করি, মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন, কুরআনের বিরুদ্ধে ষড়ন্ত্রকারীদেরকে ধ্বংস করুন এবং বাংলাদেশকে রক্ষা করুন সব ধরণের অকল্যাণ ও বিশৃঙ্খলা থেকে। আমিন। নিশ্চয় তিনি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল