সহীহ হাদীছের বিপরীতে দুর্বল ও জাল হাদীছ দিয়ে আমল প্রতিষ্ঠার পরিণতি....

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছ বিশারদ শায়খ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় হাদীছের তাহকীক, সনদ যাচাই এবং সহীহ, জঈফ ও মওযূ বর্ণনা পৃথক করার কাজে ব্যয় করেছেন। তাঁর দাওয়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল...রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর নামে যা প্রচলিত আছে, তা যাচাই না করে সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণ না করা।


রাসূলুল্লাহ (ছা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান বানিয়ে নেয়। (সহীহ মুসলিম)


অতএব রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর নামে কোনো কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অপরিহার্য। কোনো বর্ণনা সুন্দর শোনালেই, কোনো কিতাবে পাওয়া গেলেই কিংবা সমাজে বহু বছর ধরে প্রচলিত থাকলেই সেটি সহীহ হাদীছ হয়ে যায় না।


আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদারগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬)


হাদীছের ক্ষেত্রেও মুহাদ্দিসগণ এই যাচাইয়ের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তাঁরা সনদ পরীক্ষা করেছেন, রাবিদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করেছেন, বিভিন্ন সূত্র তুলনা করেছেন এবং হাদীছের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করেছেন।


এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে..জঈফ হাদীছ আর মওযূ বা জাল হাদীছ এক নয়। জঈফ হাদীছ হলো এমন বর্ণনা, যা সহীহ বা হাসান হওয়ার শর্ত পূর্ণ করেনি। আর মওযূ হলো রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর নামে বানানো বা মিথ্যাভাবে আরোপিত বর্ণনা। তাই প্রত্যেক জঈফ হাদীছকে জাল বলা যেমন ভুল, তেমনি জাল বর্ণনাকে রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর হাদীছ হিসেবে প্রচার করাও মারাত্মক অপরাধ।


শায়খ আলবানী (রহ.) তাঁর বিভিন্ন তাহকীকের মাধ্যমে অসংখ্য বর্ণনার মান যাচাই করেছেন। বিশেষ করে তাঁর সিলসিলাতুল আহাদীছিস সহীহাহ এবং সিলসিলাতুল আহাদীছিদ্-দাঈফাহ ওয়াল-মাওদূআহ গ্রন্থে হাদীছের সনদ ও বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।


তাঁর গবেষণার শিক্ষা খুব পরিষ্কার..প্রচলিত হলেই হাদীছ নয়; কিতাবে থাকলেই সহীহ নয়; বরং হাদীছের মান জানতে হলে তার সনদ ও মুহাদ্দিসদের তাহকীক দেখতে হবে।


কোনো আমল সমাজে শত বছর ধরে চলে আসছে..এটি সেই আমলকে রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর সুন্নাহ প্রমাণ করে না। আবার কোনো বক্তা, আলেম কিংবা বই কোনো বর্ণনা উল্লেখ করলেই সেটি সহীহ হয়ে যায় না। প্রশ্ন হলো..হাদীছটি কোথায়? সনদ কী? রাবিরা কেমন? মুহাদ্দিসগণ কী বলেছেন? বর্ণনাটি সহীহ, হাসান, জঈফ নাকি মওযূ?


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো..কোনো আমলের পক্ষে যখন সহীহ হাদীছ রয়েছে, তখন তার বিপরীতে দুর্বল বা জাল বর্ণনা এনে সেই আমল প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ইলমী পদ্ধতি নয়। সহীহ দলীল সামনে রেখে দুর্বল বর্ণনাকে আঁকড়ে ধরা মানে দলীলের পরিবর্তে প্রচলন ও নিজের পছন্দকে অগ্রাধিকার দেওয়া।


আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আগে কোনো বিষয়ে অগ্রসর হয়ো না। (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১)


আরও বলেন, রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং তিনি যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭)


সুতরাং কোনো ব্যক্তি, পীর, আলেম, মাযহাব, পরিবার কিংবা সমাজের প্রচলিত আমল যদি রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর প্রমাণিত সুন্নাহর বিপরীতে দাঁড়ায়, তাহলে সত্যের মানদণ্ড হবে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। ব্যক্তিকে সম্মান করা হবে, কিন্তু ব্যক্তির বক্তব্যকে ওহির ওপরে স্থান দেওয়া যাবে না।


শায়খ আলবানী (রহ.)-এর দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই—মানুষকে ব্যক্তির দিকে নয়, দলীলের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের সামান্য জ্ঞান দিয়ে হাদীছের হুকুম নির্ধারণ করবে। হাদীছ যাচাই একটি গভীর ইলমী শাস্ত্র; তাই যোগ্য মুহাদ্দিসদের তাহকীক ও হাদীছের মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে।


একজন মুসলিমের উচিত..কোনো বর্ণনা শুনে আবেগপ্রবণ না হয়ে তার সত্যতা যাচাই করা। কোনো হাদীছ জঈফ হলে তাকে সহীহ বলে প্রচার না করা এবং কোনো বর্ণনা মওযূ প্রমাণিত হলে রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর নামে তা প্রচার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।


কারণ একটি আমল ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে বড় বিপদ হলো এমন কোনো আমলকে রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর সুন্নাহ হিসেবে প্রচার করা, যা তাঁর কাছ থেকে প্রমাণিত নয়।


তাই প্রচলন নয়, প্রমাণ অনুসরণ করুন। আবেগ নয়, দলীলকে অগ্রাধিকার দিন। ব্যক্তিকে নয়, সত্যকে মানদণ্ড বানান। সহীহ হাদীছ সামনে এলে দুর্বল ও জাল বর্ণনাকে আঁকড়ে ধরে নিজের অবস্থান রক্ষা করবেন না।


আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সহীহ হাদীছ সঠিকভাবে বুঝে তার ওপর আমল করার তাওফীক দান করুন। দুর্বল ও জাল বর্ণনা থেকে আমাদের হেফাজত করুন এবং রাসূলুল্লাহ (ছা:) এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফীক দান করুন। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে সত্যের প্রতি অবিচল রাখুন এবং দলীল স্পষ্ট হওয়ার পর সত্যকে গ্রহণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।


রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা; সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১, ৬; সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭; শায়খ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.), সিলসিলাতুল আহাদীছিস সহীহাহ; সিলসিলাতুল আহাদীছিদ্-দাঈফাহ ওয়াল-মাওদূআহ।



Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post

Contact Form