ইমাম গাযালী (রহ) এর “ইহইয়া উলূমুদ্দীন” গ্রন্থের ওপর কিছু গুরুতর আপত্তি

(আকিদাগত, পদ্ধতিগত ও আচরণগত ত্রুটিসমূহ দলিলসহ সংকলন ও বিন্যাস)

 ভূমিকা:

ইমাম গাযালী – আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন – রচিত “ইহইয়া উলূমুদ্দীন” গ্রন্থটি দর্শন, চরমপন্থী সুফিবাদ এবং জাল হাদিসের মারাত্মক মিশ্রণে ভরপুর। তাই এ গ্রন্থ সম্পর্কে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। উম্মাহর কল্যাণে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি এখানে তুলে ধরা হলো।

════════════════════

প্রথমত: ইলাহিয়্যাত বিষয়ে বড় ধরনের বিচ্যুতি

(আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি ও তাওহিদ সংক্রান্ত)

১️ স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টিকে দেখা উত্তম বলা!

আপত্তি:

অলিদের বিষয়ে এমন চরম বাড়াবাড়ি করা হয়েছে যে, তাদের দিকে তাকানোকে আল্লাহর চেহারা দেখার চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।

গ্রন্থের বক্তব্য (৪/৩০৫):

গাজ্জালি আবু তুরাব নাখশাবি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি এক মুরিদকে বলেন:

“তুমি যদি আবু ইয়াযীদ বুস্তামিকে একবার দেখতে, তবে তা তোমার জন্য আল্লাহকে সত্তরবার দেখার চেয়েও উপকারী হতো!”

তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তোমার যোগ্যতা অনুযায়ী প্রকাশিত হন, আর আবু ইয়াযীদ তোমার সামনে প্রকাশিত হন—কারণ আল্লাহ তার সামনে তার যোগ্যতা অনুযায়ী প্রকাশিত হয়েছেন!

জবাব:

এটি সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। আল্লাহকে দেখা জান্নাতিদের সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত।

দলিল:

আল্লাহ বলেন:

“সেদিন কিছু মুখমণ্ডল হবে উজ্জ্বল, তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (কিয়ামাহ: ২২–২৩)

নবী ﷺ বলেন:

“তোমরা অবশ্যই তোমাদের রবকে দেখতে পাবে, যেমনভাবে এই পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পাও।” (বুখারি, মুসলিম)

সহীহ মুসলিমে এসেছে:

“আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দেবেন, তখন তাদের জন্য আল্লাহর দিকে তাকানোর চেয়ে প্রিয় আর কিছু থাকবে না।”

নবী ﷺ দোআ করতেন:

“হে আল্লাহ! আমি তোমার চেহারা দেখার স্বাদ কামনা করি।” (সহিহ)

তাহলে কীভাবে একজন অলির দিকে তাকানো আল্লাহকে দেখার চেয়েও শ্রেষ্ঠ হতে পারে?

━━━━━━━━━━━━━━

২️ হুলূল (আল্লাহ মানুষের মধ্যে প্রবেশ করেন) আকিদা

গ্রন্থের বক্তব্য (৪/৬১):

সাহল তুস্তুরি বলেন:

“নফস হলো আল্লাহর গোপন রহস্য; এই রহস্য একমাত্র ফেরাউন ছাড়া আর কারও ওপর প্রকাশ পায়নি! তাই সে বলেছিল: ‘আমি তোমাদের সর্বোচ্চ রব!’”

জবাব:

আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফেরাউনের দাবি ছিল অহংকার ও মিথ্যা।

দলিল:

“তারপর আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তি দেন।” (নাযেʼআত: ২৫)

“তার মতো কিছুই নেই।” (শূরা: ১১)

ফেরাউন ছিল জালেম ও অহংকারী—তার মধ্যে কোনো ‘ইলাহি রহস্য’ প্রকাশ পায়নি।

━━━━━━━━━━━━━━

৩️ আল্লাহর ঊর্ধ্বে অবস্থান অস্বীকার ও গুণাবলির বিকৃত ব্যাখ্যা

আপত্তি:

আল্লাহর সত্তাগত ঊর্ধ্বতা অস্বীকার, ‘ইস্তিওয়া’কে ‘ইস্তীলা’ অর্থে ব্যাখ্যা, এবং কুরআনকে ‘কালাম নাফসি’ বলা।

 জবাব:

সালাফদের সর্বসম্মত আকিদা—আল্লাহ আরশের ওপরে রয়েছেন।

দলিল:

“পরম দয়ালু আরশের ওপর 

 উঠেছেন।”

“তারা তাদের উপরে থাকা রবকে ভয় করে।”

নবী ﷺ দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন:

“আল্লাহ কোথায়?”

সে বলল: “আসমানে।”

তিনি বললেন: “তাকে মুক্ত করো, সে মুমিন।” (মুসলিম)

━━━━━━━━━━━━━━

৪️ আল্লাহর কর্মে হিকমাহ অস্বীকার

গ্রন্থের বক্তব্য (৪/১৬৮):

“আল্লাহ ফেরেশতাদের কোনো পূর্ব কারণ ছাড়াই নিকট করেছেন এবং ইবলিসকে কোনো অপরাধ ছাড়াই দূরে করেছেন।”

 জবাব:

এটি আল্লাহর ইনসাফ ও হিকমাহ অস্বীকারের শামিল।

দলিল:

“তোমার রব বান্দাদের ওপর জুলুম করেন না।”

“নিশ্চয়ই তোমার রব প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।”

ইবলিসকে তার অবাধ্যতা ও অহংকারের কারণেই বহিষ্কার করা হয়েছে।

━━━━━━━━━━━━━━

৫️ কারণ–কার্য অস্বীকার

আপত্তি:

নুন্যতম কারণিক সম্পর্ক অস্বীকার—আগুন পোড়ায় না, খাবার পেট ভরায় না ইত্যাদি।

জবাব:

আল্লাহ কারণ সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে প্রভাব রেখেছেন।

নবী ﷺ বলেন:

“হে আল্লাহর বান্দারা! চিকিৎসা গ্রহণ করো।”

আল্লাহ বলেন:

“তাতে (মধুতে) মানুষের জন্য আরোগ্য রয়েছে।” (নাহল: ৬৯)

━━━━━━━━━━━━━━

৬️ ‘ওয়াহদাতুশ শুহূদ’ ও ফানা

আপত্তি:

“অস্তিত্বে আল্লাহ ছাড়া কিছু নেই”—এই বক্তব্য।

জবাব:

আল্লাহ স্রষ্টা, আর আমরা সৃষ্টি।

দলিল:

“আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা।”

“সৃষ্টি তাঁর, নির্দেশও তাঁর।”

════════════════════

দ্বিতীয়ত: নবুওয়াত ও গায়েব বিষয়ে বিচ্যুতি

১️ অলিরা কিয়ামত ঠেকাতে পারে!

গ্রন্থের বক্তব্য (৪/৩০৫):

“যদি তারা আল্লাহকে বলত কিয়ামত না ঘটাতে, তবে তা ঘটত না।”

জবাব:

কিয়ামতের জ্ঞান ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।

“কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আমার রবের কাছে।” (আরাফ: ১৮৭)

━━━━━━━━━━━━━━

২️ কাবা অলির চারপাশে ঘোরে!

গ্রন্থের বক্তব্য (১/২৬৯):

“কাবা কিছু অলির কাছে গিয়ে তাদের চারপাশে তাওয়াফ করে।”

 জবাব:

এটি শরিয়ত ও বাস্তবতা উভয়ের পরিপন্থী।

“মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বাইতুল্লাহর হজ ফরজ।” (আলে ইমরান: ৯৭)

━━━━━━━━━━━━━━

৩️ আখিরাতের বিষয়কে রূপক ব্যাখ্যা

মিজান, সিরাত, কবরের আজাব—সবকিছুকে কেবল মানসিক অর্থে ব্যাখ্যা।

 জবাব:

এসব বাস্তব ও হাকিকি।

“আমরা কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের পাল্লা স্থাপন করব।” (আম্বিয়া: ৪৭)

━━━━━━━━━━━━━━

৪️ নবুওয়াত অর্জনযোগ্য বলা

জবাব:

নবুওয়াত আল্লাহর মনোনয়ন।

“আল্লাহ ফেরেশতা ও মানুষদের মধ্য থেকে রাসূল নির্বাচন করেন।” (হজ: ৭৫)

════════════════════

তৃতীয়ত: কুরআন ও সংগীত বিষয়ে বিচ্যুতি

১️ কুরআনের চেয়ে গান বেশি প্রভাবশালী বলা

গ্রন্থের বক্তব্য (২/২৯৮):

“গান কুরআনের চেয়ে হৃদয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।”

 জবাব:

এটি ভয়ংকর দাবি।

“এই কুরআন আরোগ্য ও রহমত।” (ইসরা: ৮২)

নবী ﷺ বলেন:

“আমার উম্মতের কিছু লোক গান-বাজনা হালাল করবে।” (বুখারি)

━━━━━━━━━━━━━━

২️ তিলাওয়াতের চেয়ে কবিতা উত্তম বলা

জবাব:

কুরআন আল্লাহর কালাম, কবিতা মানুষের।

“যদি এই কুরআন পাহাড়ে নাযিল হতো, তবে আপনি তাকে ভেঙে পড়তে দেখতেন।” (হাশর: ২১)

════════════════════

চতুর্থত: ইলম ও আমলের অবমূল্যায়ন

১️ হাদিস শিক্ষা, উপার্জন ও বিয়ে ছাড়ার আহ্বান

 জবাব:

ইসলাম ইলম ও আমলের দীন।

নবী ﷺ বলেন:

“ইলম অর্জন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।”

“বিয়ে আমার সুন্নাহ।”

━━━━━━━━━━━━━━

২️ লাদুন্নি ইলমের ভ্রান্ত ধারণা

 জবাব:

নবী ﷺ বলেন:

“ইলম আসে শেখার মাধ্যমে।”

“যদি না জানো, জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।” (নাহল: ৪৩)

━━━━━━━━━━━━━━

৩️ কাশফকে ওহির চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া

 জবাব:

অভ্রান্ত কেবল কুরআন ও সুন্নাহ।

“আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি…” (মুওয়াত্তা)

━━━━━━━━━━━━━━

৪️ যাচাই ছাড়া গল্প বর্ণনা

নবী ﷺ বলেন:

“যা শোনে সব বর্ণনা করাই মিথ্যার জন্য যথেষ্ট।” (মুসলিম)

════════════════════

পঞ্চমত: আচরণগত বিদআত ও ভ্রান্তি

১️ ওলিকে লাঞ্ছনার প্রতীক বানানো

জবাব:

“সম্মান আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদের।” (মুনাফিকুন: ৮)

২️ নতুন সালাত ও বিদআত

 জবাব:

“যে আমল শরিয়তের নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারি, মুসলিম)

৩️ চরম ওসওয়াসা ও হালাল হারাম করা

জবাব:

“আল্লাহ যে পবিত্র বস্তু হালাল করেছেন, তা হারাম করো না।” (মায়েদা: ৮৭)

৪️ কবর থেকে সাহায্য চাওয়া

জবাব:

“যদি চাও, আল্লাহর কাছেই চাও।” (তিরমিযী)

৫️ অকল্পিত ‘অকুল শাসনব্যবস্থা’ (কুতুব, গাউস, আবদাল)

জবাব:

“সৃষ্টি ও নির্দেশ একমাত্র তাঁর।” (আরাফ: ৫৪)

════════════════════

 উপসংহার ও দিকনির্দেশনা

এই গ্রন্থে মধুর সঙ্গে বিষ মিশ্রিত।

অদক্ষ পাঠকের জন্য এটি মারাত্মক ফিতনা।


 এ গ্রন্থের বিকল্প:

• মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদীন — ইবনু কুদামা

• ইবনুল কাইয়্যিমের গ্রন্থসমূহ (যেমন: মাদারিজুস সালিকীন)

আল্লাহ আমাদের উপকারী ইলম ও নেক আমল দান করুন

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post

Contact Form