ইসলামি শরিয়তে সেজদা হলো ইবাদতের সর্বোচ্চ শিখর। এই সেজদার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন এবং অন্তরের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এর হুকুম ভিন্ন হতে পারে।
নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. "আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা:" (Sajdah for Allah)
এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিশুদ্ধ বাক্য। যখন কেউ বলে 'আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করছি', তখন সে মূলত তার 'নিয়ত' বা 'উদ্দেশ্য' প্রকাশ করে।
এর অর্থ হলো—এই ইবাদতটি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এটি তাওহিদের মূল দাবি এবং এটি সম্পূর্ণ শিরকমুক্ত একটি বিশুদ্ধ ইবাদত।
এখানে কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ বা অন্য কোনো সত্তার অংশীদারিত্বের অবকাশ থাকে না।
২. আল্লাহকে সেজদা করা (Sajdah to Allah)
'আল্লাহকে সেজদা করা'—এই বাক্যটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বক্তার অন্তরের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে দুটি ভিন্ন অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে:
ক. ভ্রান্ত বা কুফরি অর্থ:
যদি কেউ মনে করে—নাউযুবিল্লাহ—মহান আল্লাহ সরাসরি তার সামনে সসত্তায় উপস্থিত আছেন এবং সে সরাসরি আল্লাহর সত্তাকে বা তাঁর পায়ে বা কুদরতি পায়ে সেজদা করছে তবে তা কুফরি হিসেবে গণ্য হবে।
কারণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা হলো—মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সপ্ত আসমানের উপরে তাঁর সুউচ্চ আরশে আজিমে সসত্তায় অবস্থান করেন। তাঁকে মাখলুকের মতো সামনে উপস্থিত কল্পনা করা বা তাঁর জন্য কোনো দৈহিক সীমাবদ্ধতা সাব্যস্ত করা আকিদাবিরোধী।
খ. সঠিক বা গ্রহণযোগ্য অর্থ:
যদি বক্তার বিশ্বাস এমন হয় যে—মহান আল্লাহ আসমানের ওপর আরশে আজিমে অবস্থান করছেন এবং তিনি সেই মহান সত্তার ইবাদতের নিমিত্তে তাঁকে (প্রাপক হিসেবে) সেজদা করছেন তবে এতে কোনো সমস্যা নেই।
এখানে 'আল্লাহকে' শব্দ দ্বারা সেজদার 'প্রাপক' বা 'মাবুদ' বোঝানো হয়েছে, সত্তাগতভাবে সামনে উপস্থিতি নয়।
বাংলা ভাষায় 'কে' বিভক্তিটি অনেক সময় সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য না করে 'নিমিত্ত', 'উদ্দেশ্য' বা 'জন্য' (Dative Case/সম্প্রদান কারক) অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এই 'কে' বিভক্তিটি যখন 'চতুর্থী বিভক্তি' (নিমিত্তার্থে) হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন তা সরাসরি সামনে উপস্থিত থাকা বোঝায় না।
অতএব কেউ যখন সঠিক আকিদা রেখে বলে—"আমি আল্লাহকে সেজদা করছি" তখন বাংলা ভাষার অলঙ্কার অনুযায়ী এর অর্থ দাঁড়ায়:
"আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদতের নিমিত্তে সেজদা করছি।"
মোটকথা,
'আল্লাহকে সেজদা করা' বাক্যটি মূলত বক্তার বিশ্বাস ও নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
যদি উদ্দেশ্য হয় 'আরশে অবস্থানকারী মহান রবের ইবাদত করা' তবে তা বৈধ।
কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় 'আল্লাহকে সামনে সত্তাগতভাবে উপস্থিত কল্পনা করা' তবে তা আকিদাগত বিভ্রান্তি ও কুফরির অন্তর্ভুক্ত।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
"নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" [সহীহ বুখারী: ১]
পরিশেষে বলবো, শব্দচয়নের ক্ষেত্রে 'আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা' বলা অধিকতর নিরাপদ এবং সংশয়মুক্ত। তবে কেউ যদি 'আল্লাহকে সেজদা' কথাটি সঠিক আকিদা রেখে বলে, তবে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য।
আল্লাহু আলাম।
উত্তর প্রদানে:
শাইখ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী (হাফিঃ)