প্রশ্ন: "যে ব্যক্তি ইশার পর চার রাকাত সালাত আদায় করবে তা লাইলাতুল কদরের চার রাকাতের সমান হবে"—এই মর্মে বর্ণিত হাদিসটির সত্যতা বা মান কতটুকু?
উত্তর:
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাহাবিগণের ওপর।
অতঃপর-
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সরাসরি বর্ণিত (মারফু) হিসেবে এই হাদিসটির কয়েকটি সূত্র পাওয়া যায়। তবে সেগুলোর কোনোটিই বিশুদ্ধ বা সহিহ নয়।
নিচে এর কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. তাবারানি 'আল মুজামুল আওসাত'-এ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)বলেছেন:
مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ وَصَلَّى أَرْبَعَ رَکَعَاتٍ قَبْلَ أَنْ يَخْرُجَ مِنَ الْمَسْجِدِ كَانَ كَعِدْلِ لَيْلَةِ الْقَدْرِ.
"যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ইশার সালাত আদায় করল এবং মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে চার রাকাত (নফল) পড়ল তা লাইলাতুল কদরের সমতুল্য হবে।"
[ইমাম হায়সামি-এর সূত্রে দুর্বলতা দেখিয়েছেন এবং শায়খ আলবানী একে জঈফ বা দুর্বল বলেছেন।]
২. আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
أَرْبَعٌ قَبْلَ الظُّهْرِ كَعِدْلِهِنَّ بَعْدَ الْعِشَاءِ، وَأَرْبَعٌ بَعْدَ الْعِشَاءِ كَعِدْلِهِنَّ لَيْلَةَ الْقَدْرِ.
"জোহরের আগের চার রাকাত ইশার পরের চার রাকাতের সমতুল্য এবং এশার পরের চার রাকাত লাইলাতুল কদরের (চার রাকাতের) সমতুল্য।"
[এর সনদে ইয়াহইয়া বিন উকবা নামক রাবী (বর্ণনাকারী) অত্যন্ত দুর্বল। তাই শায়খ আলবানি একে জঈফ বাহ
দুর্বল বলেছেন]
৩. ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:
مَنْ صَلَّى أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ خَلْفَ الْعِشَاءِ الْآخِرَةِ قَرَأَ فِي الرَّكْعَتَيْنِ الْأُولَيَيْنِ: قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ، وَقُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ، وَفِي الرَّكْعَتَيْنِ الْأُخْرَيَيْنِ: تَنْزِيلُ السَّجْدَةِ، وَتَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ كُتِبْنَ لَهُ كَأَرْبَعِ رَكَعَاتٍ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ.
"যে ব্যক্তি ইশার পর চার রাকাত সালাত পড়ল এবং প্রথম দুই রাকাতে সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস এবং পরের দুই রাকাতে সূরা সাজদাহ ও সূরা মুলক পাঠ করল তার জন্য লাইলাতুল কদরের চার রাকাতের সওয়াব লেখা হবে।"
[এর সনদে আবু ফারওয়া আর রাহাভী নামক রাবী (বর্ণনাকারী) দুর্বল এবং শায়খ আলবানি একেও জঈফ বলেছেন।]
তবে সাহাবিগণের আসার (মাওকুফ) হিসেবে এটি সহিহ সূত্রে প্রমাণিত:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বেশ কয়েকজন সাহাবি থেকে এই কথাটি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:
- আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) বলেছেন:
مَنْ صَلَّى أَرْبَعًا بَعْدَ الْعِشَاءِ كُنَّ كَقَدْرِهِنَّ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ.
"যে ব্যক্তি এশার পর চার রাকাত পড়বে, তা লাইলাতুল কদরের সমতুল্য হবে।"
- আয়েশা (রা.) বলেছেন:
أَرْبَعٌ بَعْدَ الْعِشَاءِ يَعْدِلْنَ بِمِثْلِهِنَّ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ.
"এশার পরের চার রাকাত লাইলাতুল কদরের সমতুল্য হয়।"
- আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেছেন:
مَنْ صَلَّى أَرْبَعًا بَعْدَ الْعِشَاءِ لَا يَفْصِلُ بَيْنَهُنَّ بِتَسْلِيمٍ، عَدَلْنَ بِمِثْلِهِنَّ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ.
"যে ব্যক্তি এশার পর (মাঝে সালাম না ফিরিয়ে) টানা চার রাকাত পড়বে, তা লাইলাতুল কদরের সমতুল্য হবে।"
ইবনে আবি শায়বা তাঁর 'মুসান্নাফ'-এ এই বর্ণনাগুলো এনেছেন এবং শায়খ আলবানি এগুলোকে সহিহ বলেছেন। আলেমদের মতে, এগুলো সাহাবিদের উক্তি হলেও এর হুকুম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীর মতোই। কারণ, কোন আমলে কত সওয়াব হবে—এমন গায়েবি বা অদৃশ্যের খবর সাহাবিগণ নিজের বুদ্ধি দিয়ে বলতে পারেন না। বরং তারা এটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকেই জেনেছেন।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
[উৎস: Islam web]
(সারাংশ: এই হাদিসটি মারফু তথা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মুখনিঃসৃত হাদিস হিসেবে সাব্যস্ত নয়। তবে একাধিক সাহাবীদের বক্তব্য (মওকুফ) হিসেবে প্রমাণিত। আর উসুল হাদিসের মূলনীতি অনুসারে, এমন ফজিলত পূর্ণ মওকুফ হাদিসও মারফু হাদিসের হুকুম রাখে। সুতরাং তা আমলযোগ্য ইনশাআল্লাহ।)
অনুবাদক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল