হাত থেকে কোরআন/কোরান/কুরআন পড়ে গেলে কাফফারা দিতে হয়না

আল-কোরান বিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন -উত্তর

প্রশ্ন:- মুখস্থ রাখার সুবিধার্থে কুরআনে কলম দিয়ে দাগ দেয়া যাবে কি? মুখ থেকে হাতে থুথু নিয়ে কোরআনের পৃষ্ঠা উল্টানো যাবে কি? হাত থেকে কোরআন শরীফ পরে গেলে করনীয় কী? আমরা অনেক সময় কোরআনের আয়াত মুখস্থ রাখার সুবিধার্থে কলম দিয়ে দাগ দিয়ে থাকি এটা কি ঠিক হবে?

উত্তর :-- কুরআনের সম্মান বজায় রাখার স্বার্থে কুরআনের মধ্যে এমন কোন চিহ্ন বসানো উচিৎ নয় যাতে তার সৌন্দর্যের বিকৃতি ঘটায়। কুরআনকে সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। তবে একান্ত দরকারে (যেমন, মুখস্থ করার সুবিধার্থে) চিহ্ন দেয়ার প্রয়োজন হলে, আয়াতের নিচে বা উপরে সাধারণ কাঠ পেন্সিল ব্যাবহার করা যেতে পারে, যেন তা প্রয়োজন শেষে মুছে ফেলা যায়। এ ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন রাবার ব্যাবহার করা উচিৎ।
কিন্তু বলপেন, সাইনপেন বা এমন কালি ব্যবহার করা উচিৎ নয় পরে উঠিয়ে ফেলা সম্ভব হয় না। আল্লাহু আলম।

২) প্রশ্ন : পৃষ্ঠা উল্টানোর সময় হাতে মুখ থেকে থুথু নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে থাকি এতে কি কোরআনের অসম্মান হবে? দয়া করে জানাবেন। 

উত্তর : কুরআনের পৃষ্ঠাগুলোকে সহজে উল্টানের সুবাধার্থে এমনটি করা হয়। এটা দরকারে জায়েয হলেও যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উত্তম। কেননা, তা কুরআনের আদবের সাথে সঙ্গতীপূর্ণ নয়। তাই এমনটি না করাই ভালো।আল্লাহু আলাম।

৩) প্রশ্ন : হাত থেকে কোরআন শরীফ পড়ে গেলে করনীয় কী?

উত্তর : অসতর্কতা বশত: হাত থেকে কুরআন পড়ে গেলে এজন্য আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার করলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ এবং আগামীতে সর্তক থাকতে হবে যেন, কোনভাবে কুরআনের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন না করা হয়।
উল্লেখ্য যে, আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে যে, কুরআন হাত থেকে পড়লে কুরআনের ওজন বরাবর চাল সদকা করতে হবে। এটি একটি ভুল কাজ। ইসলামী শরীয়তে এমন কোন নির্দেশনা আসে নি। তাই তা বর্জনীয়।

কি কি কারণে রোজার কাযা, কাফফারা এবং ফিদইয়া আদায় করতে হয়?

উত্তরঃ ১) যে কারণে কাফফারা দিতে হয়ঃ কাফফারা শুধু একটি মাত্র কারণেই দিতে হয়। সেটি শুধু রোজা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলন করলেই দিতে হয়। এমন কাজ কেউ করলে তার কাফফারা হল- হয় একটি রোজার পরিবর্তে ৬০ টি রোজা রাখতে হবে, অথবা ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়াতে হবে, অথবা ৬০ টি গোলাম আজাদ করতে হবে।

২) যে কারণে কাযা আদায় করতে হয়ঃ যদি কেউ অসুস্থতা, মুসাফির, মহিলাদের পিরিয়ড বা কোন দুগ্ধপোষ্য বাচ্চার মা যদি  রোজার কারণে বাচ্চার দুধ পাওয়া নাযায় ইত্যাদি কারণ থাকে তাহলে রোজা ছেড়ে দেয়া জায়েয। অর্থাৎ উপরোক্ত কারণে রোজা ছেড়ে দেয়া জায়েয। এবং এসব কারণে যেকটি রোজা ছেড়ে দিবে তা পরে অন্য কোন মাসে কাযা করে নিলেই চলবে ইন-শাল্লাহ।

৩) যে কারণে ফিদইয়া দিতে হয়ঃ যদি কোন ব্যক্তি স্থায়ীভাবে অসুস্থ হয় অর্থাৎ তার আর ভাল হওয়ার সম্ভাবনা নেই, এবং উক্ত অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে পারেনা, তাহলে তার জন্য ফিদইয়া আদায় করতে হবে।  প্রত্যেকদিন হিসেব করে একটি রোজার জন্য একজন মিসকিনকে সোয়া এক কেজি চাল দান করে দিতে হবে। প্রতিটি রোজার জন্য প্রতিদিন হিসেব করে দিয়ে দিতে হবে।

প্রশ্নঃপশ্চিম বা কিবলার দিকে পা দিয়ে বসা বা ঘুমানো যাবে না- এটা কি ঠিক? 

উত্তর : পা পশ্চিম দিকে দিয়ে বসা বা ঘুমানো যাবে না-এ মর্মে কোন হাদীস আছে বলে আমার জানা নেই। ইসলামে দলীল ছাড়া কোন কিছুকে উত্তম বা হারাম বলার সুযোগ নেই।বরং ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষ যে দিকে ইচ্ছা মাথা বা পা রেখে ঘুমাতে পারে। এতে কোন বাধ্য-বাধ্যকতা নেই।

তাই একজন মানুষ স্বাধীনভাবে যে দিকে ঘুমালে তার সুবিধা হয় সে দিকে মাথা বা পা রেখে ঘুমাতে পারে। এমনকি কিবলার দিকে পা করে ঘুমাতেও কোন দোষ নেই-যদি কিবলাকে অপমান করা উদ্দেশ্য না থাকে। বরং শুয়ে নামায পড়ার সময় কিবলার দিকে পা দিয়ে শুয়ে নামায পড়াই মুস্তাহাব অনেক ইমামের মতে। রাসূল সা. খোলা স্থানে পেশাব-পায়খানা করার সময় কিবলাকে সামনে বা পেছনে রাখতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু ঘুমের ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন নি। তাই এতেও কোন অসুবিধা নেই। আল্লাহু আলাম।

প্রশ্নঃ কোন আলেমের নিকট ইলম শিখব ? 

উত্তর: নবীদের রেখে যাওয়া আদর্শের কাণ্ডারী হল একামাত্র আলেমগণ। তারাই ইলমে নব্বীর উত্তরসূরী। আলেমগণই সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করে। দীনের জ্ঞানার্জন করতে হলে আমাদেরকে তাদের স্বরণাপন্ন হওয়ার জন্য মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করেছেন। কিন্তু কীভাবে জানবো সেই প্রত্যাশিত আলেম কে যার নিকট থেকে ইলম অর্জন করলে বা যার আদর্শকে ফলো করলে আমরা দীনের উপর অটুট থেকে আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে সক্ষম হব?
হ্যাঁ, সেই আদর্শ আলেমে রব্বানীর পরিচয় পেতে আমাদেরকে নিন্মোক্ত মৌলিক বৈশিষ্টগুলো খেয়াল করতে হবে।

১) যিনি বক্তৃতা, লিখুনি, সভা, সমাবেশ, আলোচনা, মাহফিল সর্বত্র সবচেয়ে বেশী তাওহীদের প্রতি গুরুত্ব দিবেন এবং শিরক থেকে সাবধান করবেন। এটিই নবী-রাসূলগণের প্রধানতম কাজ ছিল।
২) যিনি ছোট-বড় সকল সুন্নতকে সম্মান করবেন।
৩) যিনি ইলম অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করবেন, মানুষকে সে দিকে আহবান করবেন এবং এ পথে ধৈর্য ধারণ করবেন।
৪) যিনি হেকমত ও উত্তম পন্থায় হকের কথা বলবেন এবং তার উপর অবিচল থাকবেন।
৫) যিনি সকল প্রকার বিদয়াত থেকে মানুষকে সতর্ক করবেন।
৬) যিনি মানুষকে সালাফে-সালেহীনের আদর্শের আলোকে দ্বীন-ইসলাম মেনে চলার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন।
৭) যিনি কুরআন-হাদীসের দলীলের আলোকে কথা বলবেন এবং বিশেষ কোন মাযহাব, দল, মতবাদ, ইমাম, পীর বা অন্য কারো কথা কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত প্রমাণিত হলে তা পরিত্যাগ করে দলীলের দিকে ফিরে আসতে কোনরূপ দ্বিধা করবেন না।

প্রশ্নঃ রাত জাগার কারণে সূর্য উঠার পর নামায আদায় করলে কবূল হবে কি? অন্যান্য নামায সে সময়মতই আদায় করে। সেগুলোর বিধান কি?

উত্তরঃ ইচ্ছাকৃতভাবে সময় পার করে সূর্য উঠার পর ফজর ছালাত আদায় করলে তা কবূল হবে না। কেননা রাত না জেগে আগেভাগে নিদ্রা গেলে সময়মত উক্ত ছালাত আদায় করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল। সুতরাং বিনা ওযরে সময় অতিবাহিত করে ছালাত আদায় করলে উক্ত ছালাত কবূল হবে না। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি এমন আমল করল, যার পক্ষে আমাদের কোন নির্দেশ নেই, তবে উহা প্রত্যাখ্যাত।” আর যে ব্যক্তি বিনা ওযরে সময় অতিবাহিত করে ছালাত আদায় করে, সে তো এমন আমল করল, যার অনুমতি আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল দেননি। সুতরাং উহা প্রত্যাখ্যাত।
কিন্তু সে বলতে পারে আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম। আর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا
“যে ব্যক্তি ছালাত আদায় করতে ভুলে যায় অথবা নামায না পড়ে ঘুমিয়ে থাকে, তার কাফ্‌ফারা হচ্ছে যখনই স্মরণ হবে তখনই সে উহা আদায় করে নিবে।”
আমরা তাকে বলব, যখন কিনা তার জন্য সম্ভব ছিল যে, সময় মত জাগার জন্য আগেভাগে ঘুমিয়ে পড়বে বা এলার্ম ঘড়ি প্রস্তত করবে বা কাউকে অনুরোধ করবে তাকে জাগিয়ে দেয়ার জন্য। তখন এগুলো না করে সময় অতিবাহিত করে ঘুমের ওজুহাত খাড়া করা, ইচ্ছাকৃতভাবে ছালাত পরিত্যাগ করারই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। সুতরাং পরবর্তীতে আদায় করলে উহা কবূল হবে না।
আর অন্যান্য ছালাত সময়মত আদায় করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে।
এ উপলক্ষ্যে আমি কিছু নসীহত করতে চাইঃ মুসলিম ব্যক্তির উপর আবশ্যক হচ্ছে, এমনভাবে আল্লাহ্‌র ইবাদত করা, যেভাবে করলে তিনি তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। এ দুনিয়ায় তাকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল মাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য। কেউ জানেনা কখন তার মৃত্যু ঘন্টা বেজে উঠবে। তাকে পাড়ি জমাতে হবে পরপারের জগতে। যেখানে হিসাব-নিকাশের সম্মুখিন হবে। তখন আমলই হবে একমাত্র তার সহযোগী। মৃত্যুর পর আমল করার আর কোন অবকাশ থাকবে না। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“যখন মানুষ মৃত্যু বরণ করে, তিনটি আমল ব্যতীত তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। ছাদকায়ে জারিয়া, উপকারী বিদ্যা, সৎ সন্তান যে তার জন্য দু‘আ করবে।”

মহান আল্লাহ যেন আমাদের দীনের সঠিক ইলম অর্জন করে দুনিয়া ও আখেরাতে চুড়ান্ত সাফল্য দান করেন এবং উভয় জগতে ফিতনা ও বিপর্যয় থেকে হেফজত করেন আমীন।
আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post

Contact Form